দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া ব্রিজের নীচের বস্তির বাসিন্দারা মাথার ওপর ছাদ হারানোর আশঙ্কা নিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। গত ১২ দিন ধরে উচ্ছেদ নোটিসের বিরূদ্ধে তাঁরা আইনি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।

সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন।

“বিজেপি-কে ভোট দিয়েছিলাম তো আমরা সবাই। কিন্তু তারাই বুলডোজার চালাবে আমাদের ঘরে বুঝতে পারিনি।”

“আমাদের দেশের বাড়ি তো অনেক দূর, সেই পাথরপ্রতিমা। ওখান থেকে কাজে আসব কী করে! তাই তো এখানে ঘর করে থাকি।”

“আমরাই তো খেটে খাই। বেশির ভাগ বাড়ির ছেলেরা তো তেমন কাজ করে না। না খাটলে খাব কি? এখন তো টেনশনে রাতের ঘুম চলে গেছে।”

“বাবুর বাড়িতে বলছে, তোমরা গরীব মানুষ, কী করবে! তোমরা চলে গেলে আমাদের অসুবিধা হবে। তোমরা আসো বলে আমাদের ঘর পরিষ্কার হয়, রান্না হয় তোমাদের জন্যই তো চলে আমাদের। সরকারকে বলো তোমাদের এখানে একটা জায়গা দিতে, যাতে আমাদের বাড়িতে কাজে আসতে পারো।”

প্রায় ৩০০ জন মানুষ গৃহহীন হওয়ার আশঙ্কায় রাত কাটাচ্ছেন। ৪৩টি পরিবার। কারোওর জন্ম বেড়ে ওঠা এখানেই, কারোর পাশের জেলাতেই বাড়ি থাকলেও কাজের জন্য এখানেই রয়ে গেছেন বছরের পর বছর। দূর থেকে কোলকাতা এসে কাজ করা সম্ভব নয় এই শ্রমজীবী মানুষদের। আর তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ শ্রমজীবীই মহিলা। দুশ্চিন্তা তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি। তাই প্রতিবাদে, প্রতিরোধে পথে নেমেছেন, অবস্থাবন করছেন তাঁরাই।

“এত টেনশন, চাপের মধ্যে আছি যে কিছুই মনে থাকছে না। আমরা মেয়েরা বাবুদের বাড়ি কাজ করে এসে এখানে বসছি। আমরা আশা রাখছি ১০ তারিখ একটা সুখবর পাব। প্রশাসন তো আমাদের সঙ্গে থাকছে না। এত দিদিরা, সংগঠন আমাদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন, ভালো কিছু হবে না, বলুন?”

এই চিত্র দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া ব্রিজের নীচের ৩২ নম্বর পঞ্চানন তলা বস্তির বাসিন্দাদের। গত ১২ দিন ধরে তারা রাজ্য সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত উচ্ছেদ নোটিসের বিরূদ্ধে প্রতিরোধে আইনি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। বহু অনুরোধ ও চেষ্টা সত্ত্বেও দেখা হয়নি নগর উন্নয়ন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, এলাকার বিধায়ক স্বপন দাশগুপ্ত কারোর সঙ্গেই। কলকাতা কর্পোরেশন-এর মেয়র পদত্যাগ করায় এই মুহূর্তে সরকারিভাবে সেখান থেকেও কোনোও সহায়তা মেলেনি। এই পরিস্থিতিতে জোটবদ্ধ আন্দোলন ও বিভিন্ন শ্রমজীবী সংগঠনের মঞ্চ যোগদানের ফলেই উচ্ছেদ রোখার চেষ্টা করছেন এই বস্তির বাসিন্দারা। এর পাশাপাশি হাইকোর্টে মামলাও দায়ের করেছেন। যার রায় বেরোনো ১০ অগাস্ট।

৩৫ বছর এই বস্তিতে রয়েছেন হীরা কয়াল। আচমকা এই নোটিস পেয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন,

“আমরা তো ভয় পাচ্ছি, আমরা কোথায় চলে গিয়ে কী করব! আমাদের কোনোও জায়গা নেই, ঠাঁই নেই। কোনোও সামর্থ্য নেই যে কোথাও গিয়ে ভাড়া বাড়িতে থাকব। সেখানে ৫০০০ টাকা ভাড়া, ১০০০০ টাকা ডিপজিট। কোথা থেকে দেব? আমাদের স্বামীরা সেভাবে খাটতে পারে না। আমরা খাটতে পারলে, লোকের বাড়ি কাজ করতে পারলে খায়। আমরা ১০০০০ টাকা মাইনেই পাই হয়তো কোনো রকমে। আমাদের তুলে দিয়ে কোথায় গিয়ে থাকব? ১০ তারিখ কী রায় দেবে তাই নিয়ে খুব টেনশন হচ্ছে মাথার ভেতর। যবে থেকে নোটিস এসেছে আমাদের ঘুম নেই, খাওয়া নেই, বাড়িতে সবাই ভয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে এমন আশা করিনি। সবাই ভেবেছিলাম দেখা যাক এই সরকার এসে আমাদের কী হেল্প করে। কিন্তু আসামাত্রই যে এভাবে ঝাঁটা মারবে বুঝতে পারিনি।”

এই বস্তির বাসিন্দাদের সকলেই বলছেন, কেউই বুঝতে পারেননি, আচমকা এভাবে তুলে দেওয়ার খবর আসতে পারে। পাশের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে, সুন্দরবনে বসত থাকলেও, সেখান থেকে প্রতিদিন কাজে আসা তাঁদের পক্ষে সম্ভবই নয়।

এই বস্তিতে যাঁরা থাকেন তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগ মহিলাই সংলগ্ন এলাকায় গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন এবং সেই সূত্রে পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতির সদস্য। তাঁরা যোগাযোগ করায় এই সমিতি উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। এই উচ্ছেদের বিরোধীতায় আন্দোলনের সঙ্গে রয়েছেন সমিতির নেত্রী স্বপ্না ত্রিপাঠি।

যেভাবে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হয়, আন্দোলন শুরু হয়ে এগোচ্ছে তা অনেকটা এইরকম –

গত ২৭ জুন প্রথম ৩২ নম্বর পঞ্চানন তলা বস্তিতে উচ্ছেদের নোটিস পাঠানো হয়। তার আগে ঢাকুরিয়া ব্রিজের তলার দুই দিকে ৯০ ও ৯২ নম্বর ওয়ার্ডে কর্পোরেশন থেকে এনকোয়ারি, ছবি তোলা, তালিকা তৈরি করা হয়। নোটিস পাওয়র পর সদস্যরা সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে আন্দোলনের পথেই হাঁটা হবে। ইতিমিধ্যে ২৭ জুনের নোটিস বস্তিতে সার্ভ করা হয় ২৯ জুন। বলা হয় ৩ জুলাইয়ের মধ্যে তাঁদের উঠে যেতে হবে।

এরপরেই তাঁরা দেখা করেন বোরো ৮-এর এক্সিকিউটিভ ইঞ্চিনিয়ার-এর সঙ্গে। তিনি সরাসরি জানান কলকাতা কমিশনার-এর কাছ থেকে নির্দেশ আসায় কিছুই করার নেই। কমিশনারের সঙ্গে তাঁরা দেখা করতে পারেননি। এলাকার চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলার-এর সঙ্গেও তাঁদের দেখা হয়নি যেহেতু মেয়র-এর পদত্যাগের পর এই পদ্গুলি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। পদাধিকারী কারোওর সঙ্গে দেখা না হওয়ায় এরপরেই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন কোর্টে যাওয়ার ও ১ তারিখ কোর্টে যান।

তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল যাতে ৩ তারিখের উচ্ছেদ আটকানো যায়। যদিও তাঁরা ১ তারিখ ডেট পাননি, ২ তারিখ লিস্টেড হলেও সেদিন তাঁদের শুনানি হয়নি। এরপরেই তাঁদের তরফে আইনজীবী পুলিস কমিশনার, কলকাতা কর্পোরেশন-এর কমিশনার, বোরো ৮-এর এক্সিকিউটিভ ইঞ্চিনিয়ার সকলকে চিঠি দিয়ে আবেদন করেন যে, যেহেতু তাঁদের বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন ফলত ৩ জুলাইয়ের উচ্ছেদ যেন …